শহুরে জীবনে একসময় ফ্ল্যাটের বারান্দা ছিল এক টুকরো প্রশান্তির নাম। ইট-পাথরের খাঁচায় বন্দি জীবনে একটু খোলা বাতাস, বিকেলের নরম রোদ আর এক কাপ চা হাতে প্রিয়জনের সাথে গল্প করার অন্যতম জায়গা ছিল এই স্থানটি। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে আমাদের দেশের শহরগুলোতে, বিশেষ করে ঢাকা বা চট্টগ্রামে, এই দৃশ্যপট খুব দ্রুত বদলে যাচ্ছে। আগে যে জায়গাটি ছিল আড্ডা আর অবসরের কেন্দ্রবিন্দু, আজ তা ক্রমশ পরিণত হচ্ছে নিছক এক স্টোররুম বা গুদামঘরে।
এই পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় কারণ হলো বাসস্থানের জায়গার তীব্র সংকট। শহরে জমির দাম আর ফ্ল্যাটের ভাড়া দুটোই আকাশছোঁয়া। একটি মধ্যবিত্ত পরিবার যখন একটি ছোট বা মাঝারি আকারের ফ্ল্যাটে থাকে, তখন তাদের দৈনন্দিন জিনিসপত্রের তুলনায় ঘরের জায়গা থাকে অনেক কম। সময়ের সাথে সাথে সংসারে নতুন জিনিসপত্র যুক্ত হয়, কিন্তু ঘরের আয়তন তো আর বাড়ে না! তখন বাধ্য হয়েই পরিবারের অব্যবহৃত বা কম ব্যবহৃত জিনিসপত্র—যেমন পুরোনো আসবাব, ভাঙা স্যুটকেস, রঙ-চটা সাইকেল, বা শীতের লেপ-কম্বল রাখার জন্য ফ্ল্যাটের বারান্দা-কেই বেছে নেওয়া হয়।
অনেকেই আবার জায়গা বাঁচানোর জন্য খোলা গ্রিল ও থাই গ্লাস দিয়ে আটকে একটি অতিরিক্ত ছোট ঘর, পড়ার জায়গা, বা হোম-অফিসে পরিণত করছেন। শহরের এই বাস্তবতায় একটি উন্মুক্ত জায়গা যেন এখন এক ধরনের ‘বিলাসবহুল অপচয়’।
কেবল জায়গার অভাবেই নয়, পরিবেশগত প্রতিকূলতাও হারিয়ে যাওয়ার পেছনে সমানভাবে দায়ী। শহরের বায়ুদূষণ ও শব্দদূষণ এখন এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, দরজা খুলে রাখলেই ঘরে ঢুকে পড়ে স্তূপ স্তূপ ধুলোবালি আর গাড়ির হর্নের কানফাটানো আওয়াজ। কর্মব্যস্ত জীবনে প্রতিদিন পরিষ্কার করা অনেকের পক্ষেই সম্ভব হয়ে ওঠে না।
তাছাড়া, নিরাপত্তার বিষয়টিও একটি বড় প্রভাবক। নিচতলা বা দোতলার ফ্ল্যাটগুলোতে চুরির ভয় থাকে সবসময়। তাই নতুন বাসায় ওঠার পরপরই মানুষ প্রথমেই মোটা লোহার গ্রিল লাগায়। এরপর ধুলো আর বৃষ্টির ছাট ঠেকাতে লাগানো হয় স্লাইডিং গ্লাস। এভাবেই হাওয়া চলাচলের একটি উন্মুক্ত ফ্ল্যাটের বারান্দা ধীরে ধীরে একটি বদ্ধ, অন্ধকার স্টোররুমে রূপ নেয়।
বর্তমান সময়ের অ্যাপার্টমেন্টগুলোর নকশাতেও এই পরিবর্তনের ছাপ স্পষ্ট। এখনকার ডেভেলপাররা ভেতরের আয়তন বড় দেখাতে গিয়ে বাইরের দিকের আকার একদম ছোট করে দিচ্ছেন। অনেক আধুনিক ভবনে কেবল এসি-র আউটডোর ইউনিট রাখার মতো একটুখানি জায়গা রাখা হয়।
এর একটি বড় সামাজিক প্রভাবও রয়েছে। সামাজিকভাবে আমরা আগের চেয়ে অনেক বেশি আত্মকেন্দ্রিক হয়ে পড়েছি। আগে বিকেলে দাঁড়িয়ে পাশের বাসার প্রতিবেশীর সাথে যে কুশল বিনিময় হতো, তা এখন আর দেখা যায় না। চারপাশের এই বদ্ধ পরিবেশ আমাদের একে অপরের থেকে আরও দূরে সরিয়ে দিচ্ছে।
সব মিলিয়ে, আমাদের শহরের ফ্ল্যাটের বারান্দা আজ তার আসল রূপ হারিয়েছে। এটি এখন আর কোনো সামাজিক যোগাযোগের বা মানসিক প্রশান্তির জায়গা নেই। হয়তো জীবনের প্রয়োজনে, জায়গার অভাবে আমরা আমাদের এই ছোট্ট খোলা আকাশটুকু ছাড়তে বাধ্য হচ্ছি। কিন্তু এই কংক্রিটের জঙ্গলে একটুখানি শ্বাস নেওয়ার জায়গা হিসেবে একটি সুন্দর ও উন্মুক্ত স্পেসের প্রয়োজনীয়তা কখনোই ফুরোবে না।